বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে আমরা যাঁরা একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বইয়ের স্তূপে মাথা গুঁজে আছি, তাঁদের জন্য ‘ভর্তি পরীক্ষা’ শব্দবন্ধটাই যেন এক রক্তচক্ষু। কয়েক বছর ধরে এই যন্ত্রণাকে কিছুটা সহনীয় করে তুলেছিল গুচ্ছপদ্ধতি। কিন্তু এবার সেই স্বস্তির জায়গাটুকুও ভেঙে পড়ার উপক্রম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুচ্ছ থেকে বেরিয়ে এককভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমাদের মতো লাখো শিক্ষার্থীর মাথায় নতুন করে চেপে বসেছে হাজারো প্রশ্ন, ভয় আর হতাশা।
২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হওয়া এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও ব্যয় কমানো। একটি পরীক্ষার মাধ্যমে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সুযোগ পেলে যেমন আর্থিক চাপ কমে, তেমনি শারীরিক-মানসিক দুর্বিষহ যাত্রা থেকেও মুক্তি মেলে। গুচ্ছের অন্তর্ভুক্ত ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াইয়ে অংশ নেওয়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি ছিল ন্যায্যতা ও সুযোগের দ্বার। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সাফল্যকে পদদলিত করে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্ত আমাদের আবারও ফিরিয়ে দিচ্ছে সেই অন্ধকার যুগে, যখন ভর্তি পরীক্ষার নামে প্রতিবছর লাখো শিক্ষার্থীকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটতে হতো।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, ‘স্বকীয়তা’ ও ‘একাডেমিক স্বাধীনতা’ রক্ষায় তারা গুচ্ছ ত্যাগ করছে। কিন্তু অভিযোগ তো উঠছে অন্য কথা! ভর্তি ফরম বিক্রি, কোচিং–বাণিজ্য, হোস্টেল ও সিট–বাণিজ্যের মতো অদৃশ্য লাভের ফাঁদে পড়েই কি গুচ্ছের বন্ধন ছিন্ন করা হচ্ছে? জগন্নাথ বা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যখন আলাদা পরীক্ষার ঘোষণা দেয়, তখন আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের মনে হয়, এখানে ‘স্বকীয়তা’ নয়, ‘স্বার্থ’ প্রাধান্য পাচ্ছে। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় বারবার বলছে, গুচ্ছপদ্ধতির ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হবে, সমস্যার সমাধান খুঁজে নেওয়া হবে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সেই সুযোগ দিতে রাজি?
সে সুযোগ না দিলে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়বে বিরূপ প্রভাব, যার মধ্যে রয়েছে:
আর্থিক চাপ: গুচ্ছে থাকলে একটি পরীক্ষার ফি (প্রায় ১ হাজার-১ হাজার ৫০০ টাকা) দিয়ে ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা যেত। এখন যদি ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা পরীক্ষা নেয়, তাহলে ফি গুনতে হবে ১০ হাজার-১৫ হাজার টাকা! মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এটি চালানো অসম্ভব।
শারীরিক যন্ত্রণা: ঢাকা, সিলেট, খুলনা, কুমিল্লা—প্রতিটি পরীক্ষার জন্য আলাদা শহরে যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা মানে স্বাস্থ্যহানি আর সময়ের অপচয়।
মানসিক অশান্তি: প্রতিটি পরীক্ষার সিলেবাস, প্রশ্নপদ্ধতি ভিন্ন। বাড়তি প্রস্তুতি, প্রতিযোগিতার চাপ এবং অনিশ্চয়তা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে করবে বিপর্যস্ত।
আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু আইনি জটিলতা বা প্রশাসনিক জট থাকতেই পারে। কিন্তু সেগুলো সমাধানের দায়িত্ব কি শুধু শিক্ষার্থীদের কাঁধেই চাপানো উচিত? গুচ্ছপদ্ধতির উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষাবিদদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীরা স্মারকলিপি দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তীব্র প্রতিবাদ। আমাদের প্রশ্ন, কেন একটি সুপরিকল্পিত ও শিক্ষার্থীবান্ধবব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলতে চাইছেন তাঁরা?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে গুচ্ছপদ্ধতি বজায় রাখতে উপাচার্যদের প্রতি জোরালো নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই ইস্যুতে কঠোর হোন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের ‘স্বকীয়তা’ প্রতিষ্ঠার নামে আমাদের ভবিষ্যৎকে বন্দী করবেন না। গুচ্ছপদ্ধতিকে আরও যুগোপযোগী করুন, একে ধ্বংস নয়। মনে রাখুন, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেওয়া মানে দেশের উচ্চশিক্ষার ভিতকেই দুর্বল করা।
আপনার মতামত লিখুন :