ঢাকা শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত রাজনৈতিক দলের সংস্কার যেভাবে সম্ভব

ভোরের মালঞ্চ | অনলাইন ডেস্ক মার্চ ২২, ২০২৫, ১১:০০ এএম নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত রাজনৈতিক দলের সংস্কার যেভাবে সম্ভব

গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়েছে। তবে অভ্যুত্থানের সাত মাস পরও সমাজে এখনও দুর্ভাগ্যবশত, কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আসেনি। রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে অনেক অস্বস্তি ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মূলত রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই উদ্বেগ, অস্বস্তি ও সমন্বয়ের অভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমশ পিছিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যে একটি ঘোষণাপত্র দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, তাকে সরকার, রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এক রকমের দূরত্ব ও বোঝাপড়ার অভাব বলা যায়। এটিকে অন্তর্বর্তী সরকার ও সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ছাত্রদের এক ধরনের চাপ প্রয়োগের চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। 

 

আন্দোলন-সংগ্রামের ব্যাকরণ অনুযায়ী, এ ধরনের ঘোষণাপত্র সাধারণত অভ্যুত্থানের আগে কিংবা আন্দোলনের এক পর্যায়ে দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু অভ্যুত্থানের ছয় মাস পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ঘোষণাটি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, সাধারণত এ ধরনের উদ্যোগ অভ্যুত্থানের শরিকদের সমঝোতার ভিত্তি ও নীতিতে তৈরি হয়। কিন্তু এখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও শরিকদের যথেষ্ট বোঝাপড়া ও যোগাযোগ ছিল না। এখন তো জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তৈরি করেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ নামে একটি ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ফলে ওই ঘোষণাপত্রের প্রাসঙ্গিকতা ফিকে হয়ে গেছে, বললে ভুল হয় না।

 

সম্মুখ যোদ্ধা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্রিয় রাজনৈতিক দলের সংগঠনগুলোর মধ্যে আন্দোলনকালে শক্ত ঐক্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী শিক্ষার্থীদের এক রকমের দূরত্ব। এর সঙ্গে সংস্কারের সময়সীমা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের তারিখ আর চলমান সংস্কারে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে ইত্যাদি যুক্ত। সংস্কারের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসা। সংবাদমাধ্যমে আমরা জেনেছি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। 

 

দেশ পরিচালনার জন্য দরকার রাজনৈতিক দল। আর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দাবি তুলেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি; তা কায়েমের মূল চালকও আসতে হবে রাজনৈতিক দলের মধ্য থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এ গুণগত পরিবর্তন আনতে আগ্রহী বলে মনে হয় না। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলো গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ যোদ্ধাদের কাছে এ বিষয়ে আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং বিদ্যমান রাজনৈতিক পাটাতনে নতুন আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে এমন রাজনৈতিক শক্তির শূন্যতা রয়েছে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করার জন্য একটি রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

 

ছাত্রদের সঙ্গে সমাজের একটি যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের শক্তি ও সংযোগের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে। এখানে পরিষ্কারভাবে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা রয়েছে। কিন্তু জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো একটি রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার জন্য যে প্রস্তুতি, প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতা দরকার, সেটি কিন্তু ছাত্র সংগঠন বা সম্ভাব্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে অনুপস্থিত। সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গাটা এখনও স্পষ্ট বা শক্তিশালী নয়। ফলে পুরোনো রাজনৈতিক দলকে চ্যালেঞ্জ করতে হলে এনসিপিকে শুধু ছাত্রশক্তির ওপর ভর করলে চলবে না। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গাটা পরিষ্কার করতে না পারলে তারা খুব বেশি দূর যেতে পারবে, বলা যায় না । 

 

 

পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত মানে শুধু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন বোঝায় না। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে যে শাসন কাঠামো চলে এসেছে, তার সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান-দল-গোষ্ঠীর স্বার্থের আন্তঃসম্পর্ক বোঝানো হয়। এই সম্পর্ক বদলানো খুব সহজ নয়। পুরোনো কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বার্থের জায়গাগুলো সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের মধ্যে এক প্রকার লিখিত-অলিখিত যোগাযোগ রয়েছে। সেই যোগাযোগ ভেঙে দিয়ে নতুন বন্দোবস্তের দিকে যাওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। 

 

ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যদি ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া ও যোগাযোগ করে; তাদের সঙ্গে একটি সংযোগ তৈরি করে, তাহলে দূরত্ব কমতে পারে। দ্বিতীয়ত, পুরোনো সম্পর্ক এতই শক্তিশালী যে তারা নতুন সম্ভাব্য রাজনৈতিক শক্তিকে বিনষ্ট করতে সব ধরনের চেষ্টা চালাতে পারে। ছাত্রশক্তির মূল ভরসা হতে পারে তাদের নিষ্ঠা, ত্যাগ ও ভবিষ্যৎমুখী স্বপ্ন। তারা যদি এই তিনটি বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষ ও নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে পারে তাহলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা খানিকটা সহজ হবে। তবে এটা অল্প সময়ে হয়ে যাবে, এমন ভাবনা কোনোভাবেই ঠিক নয়।


গণতান্ত্রিক চর্চার স্বার্থে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন পরিস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে সংস্কার আনা জরুরি। এ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে না পারলে দলগুলোর মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরিষ্কারভাবে এখনও গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে।

 

এখনও প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রায় সব সিদ্ধান্ত দেশের বাইরে থেকে আসে। এই প্রবণতা কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের জন্য ইতিবাচক নয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান কাজ হচ্ছে, দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করা।

 

জামায়াতও যদি মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তাদের অবস্থান স্পষ্ট না করে এবং এ ব্যাপারে ক্ষমা চেয়ে পরবর্তী বাংলাদেশের অস্তিত্ব মেনে নেওয়ার প্রবণতা না দেখায়, তাহলে তাদের রাজনীতিও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

 

শুধু এসব কথা এ দুটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমন নয়। সব দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করা দরকার এবং তা প্রকাশ্য হওয়া জরুরি। নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রত্যেককে নতুন করে জনসংযোগ ও জনসংগঠনগুলো গড়ে তোলার ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে

Side banner